অপরূপা হিমছড়ি
সিএনজি চলছে পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ রোড; কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ দিয়ে। ভেতরে বসে আছে কয়েকজোড়া মুগ্ধ চোখ, বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে শুধু এপাশ আর ওপাশ তাকাচ্ছে। একপাশে বিশাল পাহাড় মাথা উঁচু করে স্বগর্বে দাঁড়িয়ে আছে, অপরপার্শ্বে বিরামহীনভাবে আছড়ে পড়ছে বঙ্গোপসাগরের ঢেউ। সমুদ্রের ঐ দূরে দেখা যাচ্ছে ডিঙ্গি নৌকা, দৃশ্যপট থেকে ক্রমেই বিন্দু থেকে সাগরের বিশাল বুকে হারিয়ে যাচ্ছে। সিএনজির গন্তব্য হিমছড়ি।
হিমছড়ি
হিমছড়ি বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত একটি পর্যটনস্থল। কক্সবাজার থেকে এটি ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখানে আরেকটি আকর্ষণ হলো মেরিন ড্রাইভ রোডটি। আগেই বলেছি, এটি বর্তমান বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ রোড। এটি প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক, যা বঙ্গোপসাগর এর পাশ দিয়ে কক্সবাজারের কলাতলী সৈকত থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনটি ধাপে মেরিন ড্রাইভটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে ইনানী পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার, দ্বিতীয় ধাপে শিলখালী থেকে টেকনাফ সদর পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার ও শেষ ধাপে শিলখালী থেকে টেকনাফের সাবরাং পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার সড়ক তৈরি করা হয়। আমরা সিএনজি থেকে নেমেই সরাসরি গেলাম “ হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানে ”। হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান কক্সবাজার শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে ১৭২৯ হেক্টর (১৭.২৯ বর্গ কিলোমিটার) জায়গা জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গবেষণা ও শিক্ষণ, পর্যটন ও বিনোদন এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ।
বনাঞ্চল ও অভয়ারণ্য
অসাধারন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে আমরা যেন বারবার অভিভূত হয়ে পড়ছিলাম। উদ্যানের গেটের বাইরে বাজারে বিভিন্ন রকম অনিন্দ্যসুন্দর জিনিস দেখতে দেখতে আমরা প্রবেশ করলাম হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানে। এতক্ষণ ধরে দেখে আসা সমুদ্রও এবার আড়াল হয়ে গেল। চারিদিকে পাহাড়,গাছ-গাছালি আর পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ। পাখিপ্রেমীদের জন্য হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান একটি আদর্শ স্থান। এখানকার প্রায় ২৮৬ প্রজাতির পাখির মধ্যে ময়না, ফিঙ্গে ও তাল বাতাসি উল্লেখযোগ্য। শুধুমাত্র পাখিই না, হিমছড়ি বনাঞ্চল হাতির আবাসস্থল বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া এ বনে মায়া হরিণ, বন্য শুকর ও বানর দেখা যায়। এ বনে ৫৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৫৬ প্রজাতির সরীসৃপ ও ১৬ প্রজাতির উভচর প্রাণী পাওয়া যায়। এখানকার পাহাড়গুলো খুব বেশি উঁচু না হলেও যথেষ্ট উঁচু। হিমছড়ির অন্যতম সেরা দৃশ্যগুলির একটি হলো পাহাড়ের চূড়া থেকে সমুদ্র দেখা এবং তার গর্জন শোনা।
পাহাড় ও সমুদ্র
তবে পাহাড়ে ওঠা যে কি পরিমান কষ্টসাধ্য, তা তো বলার বাইরে। পাহাড়গুলোয় ওঠার জন্য সিঁড়ি আছে,বেশ খাড়া সিঁড়ি। আমরা প্রত্যেকেই বেশ হাঁপিয়ে উঠছিলাম উঠতে উঠতে, তাই কয়েকবার দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। শেষমেষ চূড়ায় পৌঁছে মনে হলো কিসের ক্লান্তি আর কিসের বিশ্রাম! আকাশের এত কাছে এসে যেন আমরা সবাই পাহাড়ে ওঠার ক্লান্তি বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। প্রকৃতির অসাধারন রূপ দেখে আমাদের ঘোরের মতো লাগছিলো। ঘোর শেষ হতেই লেগে পড়লাম ছবি তুলতে। নিজেকে এই প্রকৃতির একটি অংশ হিসেবে স্থিরচিত্র তোলার এই বিরল সুযোগ কি সহজে আসে?
পাহাড়ে বেশ খানিকক্ষণ সময় কাটানোর পর আমরা গেলাম হিমছড়ির ঝর্ণা দেখতে। যদিও সেসময় সেখানে খুব বেশি পানি ছিলো না। ঝর্ণার পানি বেয়ে পড়ার পাথরগুলোর গাঁথুনি ছিলো দর্শনীয়।
ঝর্ণা
এরপর আমরা উদ্যান থেকে বের হয়ে মেরিন ড্রাইভের পাশে সৈকতে যাই। এখানে কোন পয়েন্ট না থাকায় সৈকতটি বেশ চুপচাপ, শুধু সমুদ্রের স্রোতে আর বঙ্গোপসাগরের উত্তাল বাতাসের আওয়াজ শোনা যায়।
সৈকতে নেমেই শুরু হয়ে গেল আরেক দফা ছবি তোলার পালা।আসলে জায়গাটি এতই মনোরম যে, কেউই আসলে নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারবেন না। সাধারণত এই সৈকতে নববিবাহিত জুটি এবং পরিবারগুলো একান্তে সময় কাটায়। এরপর সৈকতে বিশালাকার ডাবের পানি খেয়ে আমরা ফেরার পথ ধরি। কিন্তু ফেরার পথে হিমছড়ির পাহাড়, সমুদ্র এবং মেরিন ড্রাইভকে কথা দিতে দিতে যাই, এই আসাই শেষ নয়; আবার ফিরবো তোমারই কোলে। যেমন জীবনানন্দ বাংলাকে কথা দিয়েছিলেন,
“আবার আসিবো ফিরে,
ধানসিঁড়িটির তীরে,এই বাংলায় !”
হিমছড়ি সমুদ্র সৈকত
Leave অপরূপা হিমছড়ি to:
Read more #bdc posts
Best Posts From tahmidtwelve
We have not curated any of tahmidtwelve's posts yet. But you can encourage our curation team to review posts by visiting them regularly and by referring other readers. Because we give priority to frequently read content.