নতুন চাকরি, নতুন জীবন, নতুন অভিজ্ঞতা...
সবকিছু বাদ দিয়ে আজ ভোর ছয়টায় কুমিল্লা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই। তবে যাত্রার পথ সহজ ছিল না। ভেবেছিলাম, লকডাউনে রাস্তা ফাঁকা থাকবে, তাই জলদি পৌছে যেতে পারব। কিন্তু কুমিল্লা ঢাকা মহাসড়কের বাখরাবাদ এলাকায় দেখলাম এক কাভার্ড ভ্যানের সাথে প্রাইভেট কারের সংঘর্ষ হওয়ায় পুরো রাস্তার দুই দিকেই জ্যাম লেগে আছে। পরে র্যাকার এর মাধ্যমে ভাঙ্গা গাড়ি সরিয়ে রাস্তা ক্লিয়ার করা হয়েছে। প্রায় ২ ঘন্টার মতো আটকে থাকতে হয়েছিল।
আমাদের গাড়ি নারায়নগঞ্জের সাইনবোর্ড পর্যন্ত আসতে পেরেছিল। এরপর আর পুলিশ ঢুকতে দেয় নি ঢাকার দিকে। সাইনবোর্ডের পুরো এলাকা জুড়ে আজ হাজার হাজার মানুষ গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল। লকডাউনের কারণে পাবলিক বাস বন্ধ থাকায় এত মানুষের ভীড় জমে গিয়েছে। যে যেভাবে পারে রিকশা হোক বা ভ্যান গাড়ি, ঢাকায় ঢুকার চেষ্টা করছিল। এই সুযোগে রিকশাওয়ালা কিংবা ভ্যানওয়ালারা মানুষের কাছ থেকে চড়া ভাড়া আদায় করে নিচ্ছিল।
আমিও ঘন্টাখানেকের মতো অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত সাইনবোর্ড থেকে সরাসরি আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত আসতে বাধ্য হয়েছি। যেহেতু আমি নতুন অফিসে জয়েন করেছি, তাই আমাকে আজ গাজীপুর আসতে হয়েছে। এর আগেও আমি প্রায় ১ বছর এখানে কাজ করেছিলাম। আব্দুল্লাহপুর থেকে আশুলিয়া পার হয়ে একটু পরেই গাজীপুরের কাশিমপুর থানা। আমার নতুন ঠিকানা আপাতত এইটাই।
সাইনবোর্ড থেকে সরাসরি বাইকে করে আব্দুল্লাহপুর আসতে পারলেও আব্দুল্লাহপুর এসে পুরোপুরি বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম। এরপরে আর কোনো ধরনের গাড়ি চলে না। পরে অনেক খুঁজে শেষপর্যন্ত একটা রিকশা নিয়ে প্রথম বেরিবাধ, এবং পরে বেরিবাঁধ থেকে রিকশা নিয়ে কাশিমপুর আসতে হয়েছে। কুমিল্লা থেকে এ পর্যন্ত আসতে আমার মোট ১২০০ টাকা খরছ হয়েছে আজ। অথচ অন্য যে কোনো সময় ৩০০ টাকার বেশি কোনো ভাবেই খরচ হতো না।
আজকে রাস্তাঘাটে গাড়ির জন্য মানুষের হাহাকার দেখে খুব খারাপ লাগছিল। পুরুষেরা হয়তো কোনো না কোনো ভাবে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু নারী ও শিশুদের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। তার উপর দুপুরের দিকে প্রচন্ড গরম পড়েছিল আজ। এই অবস্থায় ঘন্টার পর ঘন্টা তীব্র গরমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা যে কারো জন্য খুব কষ্টকর। রাষ্ট্রের কিছু বিবেচনাহীন সিদ্ধান্তের জন্য এত এত মানুষকে কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে, তা ভাবলেও নিজেকে খুব অসহায় লাগে।
যায় হোক, দুপুর একটার দিকে আমি আমার নতুন অফিসে পৌছি। খাওয়া দাওয়া করে একটু রেস্ট নিয়ে আমি আমার সব কাজ বুঝে নিয়েছি। আগের কাজের চেয়েও এখানের কাজটা খুব বেশি চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে আমার। যেহেতু দীর্ঘদিন ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন বন্ধ ছিল, তাই নতুন করে সবকিছু শুরু করতে হচ্ছে। সে হিসেহে সবকিছু সুন্দর করে মেইনটেইন করতে হলে আমাকে যে প্রচুর চ্যালেঞ্জ এর মুখোমুখী হতে হবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
সবকিছু মিলে আজকের দিনটা কেমন যেন কেটে গিয়েছে। বিশেষ করে সকালে এক্সিডেন্ট হওয়া দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া প্রাইভেটকারটার কথা চিন্তা করে খুব বেশি খারাপ লাগছে। গাড়িতে থাকা যাত্রীদের বর্তমান অবস্থা কী, তা খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছিল কিন্তু কোনো ভাবেই সাহস হচ্ছে না। আমি মনে প্রাণে তীব্র ভাবে চাই, যত যাই হোক না কেন, সবাই যেন সুন্দর করে তাদের বাড়ি ফিরতে পারে, প্রিয় মানুষদের কাছে ফিরতে পারে।
এক্সিডেন্টটা দেখার পর আমার নিজেরও কিছুটা ভয় ভয় কাজ করছিল। আমি যে এবার নতুন চাকরিতে জয়েন করেছি, সেটাতে আমার মা মোটেও রাজী ছিলেন না। উনি চাচ্ছিলেন আরো কিছুদিন যেন আমি অপেক্ষা করি। এমনিতেই করোনার যে অবস্থা, তাই মা আমাকে একা ছাড়তে চাচ্ছিলেন না কোনো ভাবেই। তবুও উনার অনিচ্ছা সত্বেও আমি অনেকটা জোর করে উনাকে রাজী করিয়েছি। এজন্য নিজের মনের ভেতর একটু হলেও ভয়ের অনুভূতি ছিল।
তবুও সব ভয়ের আশংকা কাটিয়ে ঠিকভাবে যে পৌছতে পেরেছি, সেইটাই অনেক। তবে এখানে আমাকে অবশ্যই অনেক সাবধানে কাজ করতে হবে। আজ ভ্যাক্সিনের জন্য রেজিস্ট্রেশন করিয়েছি। যে কোনো দিন ভ্যাক্সিন নেয়ার জন্য ডাকবে। শুনেছি লকডাউন ১০ তারিখ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এরপর যারা ভ্যাক্সিন নিয়েছে, তারা রাস্তায় বের হতে পারবে। যেহেতু আমার কাজের ধরন অনুযায়ী প্রতিদিন বহু মানুষের সাথে মিশতে হয়, তাই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার রিস্ক একটু বেশিই। আশা করি সব খারাপ কিছু থেকে বেঁচে থাকতে পারবো।
Leave নতুন চাকরি, নতুন জীবন, নতুন অভিজ্ঞতা... to:
Read more #hive-190212 posts
Best Posts From Shamim Reza
We have not curated any of reza-shamim's posts yet. But you can encourage our curation team to review posts by visiting them regularly and by referring other readers. Because we give priority to frequently read content.