Md.Habibur Rahaman avatar

দিনুর জীবনের বাস্তব গল্প

naturelover98

Published: 14 Jul 2020 › Updated: 14 Jul 2020দিনুর জীবনের বাস্তব গল্প

দিনুর জীবনের বাস্তব গল্প

Somesshori river,birishiri.jpg



ওর নাম দিনু শুনেই আমার মনে পরে গেল ছোট বেলায় পড়া রবীন্দ্র নাথের ছুটি গল্পের দিনু চরিত্রের ছেলেটির কথা। যদিও তাদের সাথে কোন মিল রয়েছে শুধুই নামের। আজ আমি দিনুর জীবনের কাহিনী আপনাদের শুনাবো।

বিশেষ কাজে আমি মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর থানার আবুডাঙ্গা নামক গ্রামের যাই।রাস্তার মাঝেই নদী পরল।খেয়া পারাপার।যমুনার নদীরই একটি শাখা এটি দৌলতপুর থেকে ঘিওর হয়ে কালীগঙ্গায় মিলিত হয়েছে।

যাই হোক আমি গাড়ি থেকে নেমে নদীর ঘাটে গেলাম ওপারে যাওয়ার জন্য।কিন্তু খেয়া ঘাটে একটি মাত্র খেয়ার বড় নৌকা।আর দুই একটা ছোট নৌকা আছে।আমি খেয়ার নৌকার অপেক্ষা না করে একটি নৌকা ডাকলাম।একটি ছোট ছেলে তার নৌকা নিয়ে চলে আসলো। আমি কাছে যেতেই দেখলাম নৌকার মাঝি অর্থাৎ ছেলেটি অনেক ছোট বয়স ১০ থেকে ১২ হবে।আমি আরো খেয়াল করে দেখলাম নৌকাটি ভাঙ্গা।

আমি একবার তাকাই নৌকার দিকে আবার তাকাই ছেলেটার দিকে।ভাবনায় পরে গেলাম বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমি নৌকায় উঠবো কিনা।ও দিকে খেয়ার নৌকা ও আসতে দেরি করছিল।তাই আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে উঠে পড়লাম।

আমার শরীরের ওজন একটু বেশি হওয়ায় নৌকাটি আমার পাশেই বেশি ডুবে ছিল।তাই ছেলেটি নৌকা ঠিক মতো বাইতে পারছিলো না।তাই আমি নৌকার মাঝামাঝি গিয়ে বসলাম।তার পর ছেলেটি ভাল করে নৌকা বাইতে লাগলো একদম বড় মাঝিদের মতো। আমার গন্তব্য স্থলে গিয়ে পৌছাতে প্রায় ৩০ মিনিটের পথ। আমার চুপচাপ ভাল লাগছিল না।

হঠাৎ করে আমার খুবই জানতে ইচ্ছা হলো এই ছেলেটি সম্পর্কে ।আমি ছেলেটির দিকে ঘুরে বসলাম।তার পর জিজ্ঞাসা করলাম এই ছেলে কি নাম তোমার? ছেলেটি আমাকে বলল আমার নাম দিনু। বললাম বয়স কত তোমার ? ও আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বলল স্যার আমি কইতে পারমু না আমার মায় জানে। কেন যেন ওর প্রতি আমার আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। আমি বললাম আমাকে স্যার বললা কেন? ও আমাকে বলল আপনে তো সাট প্যান পরা তাইলে আপনে তো স্যারই। ছেলেটি প্রতিটি কথায় আমি মুগ্ধ হচ্ছিলাম এতো সহজ সরল। আমি কিছুক্ষন ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম তুমিতো অনেক ছোট নৌকা নিয়ে
ভাড়া বাইতে তুমি কেন আসছো? তোমার বাবা কিন্তু বাড়িতে গেলে তোমাকে বকা দিতে পারে।
সে আমার দিকে টলমল চোখে তাকিয়ে বলল আমার বাপে থাকলে তো মাড়বো। আমি বললাম কেন তোমার বাবা বাড়ি নেই?কই গেছে? ও তখন একটু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল আমার বাপে তো মেলাদিন আগে মইরা গেছে।আর আমি নৌকা না চালাইলে টেকা পামু কই আর খামু কি?আর আমার মায়, বুইনে খাইবো কি? ওর চোখের কিনারে কান্নার আভাস পেলাম। আমি ওর আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অন্য কিছু বলতে থাকলাম ।কিন্তু কেন যেন আমার মন ওর সম্পর্কে জানতে চাইছিল। একটু পর দেখি ও স্বাভাবিক হয়ে গেছে তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম দিনু তোমার বাড়িতে কে কে আছেন? ও বলল আমাগো বাড়ি আমার মায়, আমি, আমার দুইডা ছোট বুইন আছে। তার পর বললাম তুমি স্কুলে যাও না? দিনু বলল নাহ।যাই নে,আমাগো টেহা পয়সা নাই।আমার বাপ নাই।মায় এতো টেহা কোনে পাইব?

আমি জিজ্ঞাসা করলাম তোমাদের বাড়ি কই? ও হাত উঁচু করে পাশের একটি চরের দিকে দেখাইল।সেখানে কিছু বস্তি দেখতে পেলাম।কিছু খরির ঘর উঠানো আছে ওখানে। তার পর ও একা একাই বলতে লাগলো স্যার আমাগো বাড়ি আসলে এহানে না অন্য জাগায় আছিল ।আমার বাড়ি নদিতে ভাইঙ্গা গেছে।থাহার জাগা নাই তাই আমরা চরে জাইয়া ঘর উটাইছি।

আমি দিনুকে বললাম তোমার মা কি কাজ করেন? কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল স্যার আমার মায় কয়দিন দইরা অসুস্থ কিছুই করে না, আমার মার জর আইছে।তাই হুয়ে থাহে। আমাগো কাছে টেহা পইসা নাই।তাই মা রে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাইবের ও পারতেছি নে। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম আগে কি করতেন তোমার মা? বলল বাড়ি বাড়ি কাম করে।এহন তো চার পাশে পানি । গ্রামে কার বাড়িতে কাম কাজ নাই।তাই কি আর কইরবো?বারি থাহে। বললাম তোমরা খাও কি আর কি ভাবে?সে বলল আমার মায় ধানের বতরের সময়ে মানসের বাড়ি বাড়ি কাম কইরা ধান পাইছে কিছু।সে গুলা খাই।আর এই যে আমি নৌকা চালাই সারা দিন যা পাই তাই দিয়া তরকারি কিনি।

দিনুর সম্পর্কে এতোটুকু জানার পর আমার মাথা আর ঠিক মতো কাজ করতেছিল না।আমার আরো অনেক কিছুই প্রশ্ন ছিলো জানার জন্য।কিন্তু আমার মুখ দিয়ে আর কিছুই বের করতে পারছিলাম না। আমি শুধুই ভাবতেছিলাম এতো দুখি মানুষও পৃথিবীতে আছে??আমি তো তা হলে অনেক সুখেই আছি আলহামদুলিল্লাহ্।

সমস্যা গুলো আমার মাথায় ব্যথা দিতে শুরু করছিল
১।দিনু ছোট মানুষ হয়ে নৌকা চালাচ্ছে
২।ভাল একটা নৌকা ও নেই
৩।দিনুর বাবা নেই
৪।দিনুর বাড়ি নেই
৫।দিনুর মা অসুস্থ
৬।সে পড়াশুনার সুযোগ পায় নি
এগুলোই মনে পরতেছিল।

এ দিকে আমি আমার গন্তব্য স্থলে পৌঁছে গেছি এখন তো আমাকে নৌকা থেকে নামতে হবে। ভাড়া কতো দিব জিজ্ঞাসা করলাম ও বলল স্যার দেন আপনে।
আমি ছাত্র মানুষ আমার কাছে তো বেশি টাকা থাকে না। মানিবাগের চিপায় রাখা ৫০০ টাকার একটা নোট ছিল। মনে পড়ে খুবই খুশি লাগলো।তারাতারি টাকাটা বের করে আমি দিনুর হাতে দিলাম। দিনু বলল স্যার আমার কাছে ভাংতি নাই। আমি বললাম আমি পুরো টাকাই তোমাকে দিলাম।কিন্তু সে নিতে নারাজ। সে বলল স্যার আমারে ৩০ টেকা দেন তাই হইব। আমি তখন বুঝলাম ওকে না বুঝালে ও টাকাটা নিবে না।তাই বললাম দিনু শোনো তোমার মা অসুস্থ।তুমি টাকা টা নিয়ে যাও।আমি তোমাকে ভাড়া দেই নি।ফ্রি তেই আস্লাম।আর তোমার মা আমার মায়ের মতই তাই তার চিকিৎসা হওয়ার জন্য টাকা দিলাম।কাল সকালে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেয়ো। অবশেষে টাকাটা নিল,আর আমি নৌকা থেকে নেমে পড়লাম।

কেন যেন আমার শান্তি লাগতেছিল আবার অনেক কিছু ভাবতেও ছিলাম কিন্তু আমি তো একটি কাজের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম তাই সে দিকেই মনোনিবেশ করলাম।

দিনু

Somesshori river,birishiri21 (2).jpg

বন্ধুরা,আমি দিনুর জীবনের সত্য ঘটনা আমি আপনাদের সাথে আমার নিজের মতো করে ছোট গল্প আকারে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।আশা করি সবার ভালই লাগবে।আমার কোন ভুল হলে ক্ষমা করবেন।
ধন্যবাদ সকলকেই

বিদায়

Leave দিনুর জীবনের বাস্তব গল্প to:

Written by

Hi, I am Md.Habibur Rahaman from Bangladesh.I am a Grapics+Web Designer and Web Developer also.

Read more #bdcommunity posts


Best Posts From Md.Habibur Rahaman

We have not curated any of naturelover98's posts yet. But you can encourage our curation team to review posts by visiting them regularly and by referring other readers. Because we give priority to frequently read content.

More Posts From Md.Habibur Rahaman