আত্মচিৎকার
আত্মচিৎকার
বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছিলাম আমাদের গ্রূপের বন্ধুরা মিলে কোথাও ঘুরতে যাবো। আর সেটা অবশ্যই দূরের যাত্রা হবে। একদিন সবাই মিলে পরামর্শ করলাম কিভাবে ও কোথায় যাওয়া যাই। পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত হলো চট্টগ্রামের কোন একটা পাহাড়ি এলাকা আমরা সবাই মিলে ঘুরতে যাবো। আমরা সবাই বলতে মোট ১৩ জন। ৬ জন ছেলে আর সাত জন মেয়ে। আমরা সবাই একই গ্রূপের স্টুডেন্ট। এখন শুধু নিজেরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিলে তো হবে না , পরিবারের সদস্যদের থেকে অনুমতি নিতে হবে। তাই সবাই মিলে আবারো একটা প্ল্যান করি কি ভাবে সবার পরিবারকে রাজি করানো যাই।
তারপর আমরা সবাই একটা গ্রূপ হয়ে সবাই সবার বাসায় যাই ও সবার বাবা মাকে সবাই মিলে অনুরুদ করে রাজি করায়। এখানে অনেকের বাবা মা অমত করলেও সবাই মিলে রাজি করে আমরা। সবার পরিবার রাজি হয়ে গেলে এবার যাওয়ার সময় দিন ঠিক করলাম। ঘুরতে যাওয়াকে উদ্দেশ্য করে সবার প্রস্তুত হয়ে তার ঠিক ৩ দিন পরেই আমরা যাবো বলে সিদ্দান্ত নিলাম। আমাদের জন্য ২ টা মাইক্রো বাস ভাড়া করি। একটি মাইক্রো বাসে ছেলেরা ও একটি মাইক্রো বাসে মেয়েরা। যাওয়ার দিন সকালে আমরা সবাই একসাথে হয়। সবাই মাইক্রো বাসে উঠে বসার পর গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছিলো না। প্রায় আধা ঘন্টা চেষ্টা করার পর গাড়ি স্টার্ট নেই ও আমাদের যাত্রা শুরু হয়।
গাড়িতে সবাই অনেক গান বাজনা , আনন্দ-ফুর্তি করছিলাম নানা ধরনের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আমরা মজা করছিলাম। অনেক আনন্দের সাথে আমাদের সময় কাটছিল। আমরা যখন মাঝামাঝি যাই তখন একটি বিরতি নেই। গাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করি। কেউ কেউ এটা সেটা কিনে খাচ্ছে এভাবে ১৫ মিনিট পর আবার গাড়ি চলতে শুরু করে। সবাই একসাথে আনন্দময় সময় গুলো যেন মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেলো। কয়েকঘন্টার মধ্যে আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে যায়। সেখানে একটি বাংলোতে আমরা উঠি।
জায়গাটা আমরা যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়েও বেশি সুন্দর ছিল। খুবই ভালো লাগছিল ওখানের পরিবেশটা। আশেপাশে কোন দোকানপাট ,বাড়িঘর নেই। একদম নিরব একটি জায়গা সবার কাছে জায়গাটি পছন্দ হয়েছে। যাই হোক বাংলোটা ছিল বিশাল বড়। ওখানে থাকার রুম ছিল ৯ টা। আর প্রতিটা রুমের সাথে একটি করে ওয়াশ রুম ও একটা ডাইনিং রুম। আর উপরের ছাদের মধ্যে বসার সুন্দর একটা পরিবেশ ছিল। এবার আমরা সবাই যার যে রুম ভালোলাগে সে রুমে প্রবেশ করলাম। একটি রুমে ২ টি করে ব্যাড দেয়া আছে। আমরা যে যার মতো করে রুম গুছিয়ে নিলাম। পুরোটা বাঙলো আমাদের ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন বাংলোর কেয়ারটেকার।
দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসছে তাই আমরা সবাই ফ্রেশ হয়ে বাহিরে যাই রাতের খাবার খাবো বলে আর আশপাশটাও একটু ঘুরে আসবো। সবাই একসাথে বের হওয়ার সময় আমরা নিজেরা নিজেদের রুম ভালো করে লক করে বের হয়। কারণ সন্ধ্যার পর কেয়ারটেকার সেখানে থাকতেন না। আশে পাশে জায়গা দেখতে থাকি আর খাবারের জন্য হোটেল খুঁজতে থাকি। আশেপাশের পুরোটা জায়গা ছিল পাহাড়ি এলাকা তেমন দোকানপাট ছিল না। মানুষজন তেমন নেই সামনে একটি রিসোর্ট আছে সেখানেও মানুষ নেই। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম এখানে আসার একটি সময় আছে। মাসের শেষের দিকে আসতে হয় , আর আমরা এসেছি মাসের শুরুর দিকে , তাই মানুষ ছিল না। কিছুদূর যেতেই একটি হোটেল পাই সেখানে রাতের খাবার সেরে আমরা সকালের জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি। আমরা যখনই বাংলোতে ফিরে আসি তখন দেখতে পায় বাংলোর গেট খোলা ও প্রতিটি রুমের দরজাও একদম খোলা। মনে হচ্ছে আমরা যাওয়ার পর কেউ এখানে এসেছে আর পুরো বাংলোর মধ্যে আমাদের খুঁজে বেরিয়েছে।
তখন আমরা সবাই দৌড়ে যায় যার যে যার রুমে। গিয়ে সবার ব্যাগ চেক করে দেখি সব কিছুই ঠিক আছে। তারপর আমি বললাম হয়তো কেয়ারটেকার যায়নি আমাদের আসতে দেখে আগে থেকেই দরজা খুলে রেখেছে। সবাই বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবেই নিলাম। তারপর সবাই সবার মতো ফোনে সবার পরিবারের সাথে কথা বলে আমিও আমার পরিবারের সাথে কথা বলে রুমের লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়ি।
সকালে ঘুম থেকে উঠে সবাই একত্রে ডাইনিং রুমে আসি। সবার রাতের ঘুম কেমন হলো সেটা একজন আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করতে থাকি। হঠাৎ আমাদের একজন বলছে কিরে আমাদের মধ্যে আরেক জন কোথায় ? তাকে যে দেখতে পাচ্ছিনা। তখন আমরা সবাই মিলে ওয়াশরুম , ছাদ সব জায়গাতেই খোঁজাখুঁজি করেছি। কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার সাথের কয়েকজন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আমিও কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তখন সামনে কেয়ারটেকারকে দেখতে পাই তাকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি কি আমাদের সাথে একজনকে কে দেখেছেন ? উনি বলল আরে চিন্তার কিছু নেই সামনে একটা বাগান আছে ওখানে আমি তাকে যেতে দেখেছি। হয়তো বাগানের ভিতরে আছে। সকাল সকাল বাগানে যেতে খুবই ভালো লাগে। কেয়ারটেকার একথা শুনে একটু শান্তি পেলাম।
আমি বললাম ওকে সবাই মিলে গিয়ে নিয়ে আসি তারপর সবাই না হয় ঘুরতে যাব। সবাই একসাথে বের হতেই ছেলেদের মধ্যে একজন বলল আমরা ২জন গিয়ে ওকে নিয়ে আসি আর তোরা ঘুরতে যা। পরে আমরাও আসছি, আমরা বাকিরা বললাম ঠিক আছে, তোরা ওকে নিয়ে আয় আর আমরা ঘোরাফেরা করতে বের হয়ে যাই। কিছুদূর যাওয়া মাত্রই দেখতে পেলাম অনেক উঁচা পাহাড়ের চূড়া। সবাই খুবই আনন্দিত এত সুন্দর একটি জায়গাতে আসতে পেরে। আমরা সেখানে কিছু খাবার নিয়ে যাই আমরা বিকাল পর্যন্ত সেখানে ছিলাম। সময়টা যে কখন চলে গেলো বুঝতেই পারলাম না। হঠাৎ ভাবলাম ওরা ৩ জন তো আসার কথা ছিল। কিন্তুবিকাল হয়ে গেল এখনো আসেনি কেন, তাই আর দেরি না করে আমরা সেখান থেকে চলে আসব এমন সময় পিছন থেকে একটি মেয়ের চিৎকার শুনতে পায়। সে চিৎকার শুনে আমরা প্রচন্ড ভয় পায় তাই দ্রুত সেখান থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করি কিন্তু কিছু দূর যেতেই আমরা আবারো একটি চিৎকার শুনতে পায়। তখন ভয় আমাদের আরো বেড়ে যাই। এবার সবাই দৌড়াতে শুরু করি দৌড়াতে দৌড়াতে আমি হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়।
সবাই তাড়াতাড়ি আমাকে ধরে তুলে। আমি নিচের দিকে খেয়াল করতেই দেখলাম একটি অর্ধাংশ শরীর মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগে মাত্র এটিকে কোন জানোয়ার বিদখুডে ভাবে খেয়েছে। শরীরের মধ্যে মাথা ছিল না তাই বুঝতে পারিনি কার ছিল অর্ধাংশ শরীর। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। প্রানপনে সবাই সেখান থেকে ছুটতে শুরু করি। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা আমাদের বাংলোতে পৌঁছে যায়। পৌঁছে দেখি বাকিরা সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে আমাদের সাথে কি ঘটেছে তা বলার কোন শক্তি আমাদের কারোই নেই। তখন আমাদের মধ্যে একজন বললো কিরে তোরা না ওকে খুঁজতে গিয়েছিলি? কোথায় আসেনি সে? তখন তারা ২ জন কান্নাকাটি শুরু করল আর বলতে লাগল আমরা সেখান থেকে দৌড়ে এসেছি। আর আমাদের সাথে আরেকজন কে আমরা সেখানে হারিয়ে ফেলেছি। আমি কথাটা শুনে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। আমি আমাদের সাথে ঘটে যাওয়া সব কথা খুলে বলি।
ঘটনা শুনে সবাই খুব ভয় পেয়ে যাই। তাই তখনি সবাই সাথে সাথে সবার ব্যাগ গুছিয়ে ফেলি। পরের দিন সকালেই আমরা বেরিয়ে পড়বো। রাত তখন সাড়ে নয়টা নাগাদ আমি সবাইকে বলি দেখ যা হয়েছে হয়েছে কাল বাড়িতে যাওয়ার পর বাকিটা এখন সবাই খাওয়া দাওয়া কর আর আজ আমরা সবাই একই সাথে একই রুমে বসে থাকব। সেই রাতে আমরা কেউ কোনো খাবার খেতে পারিনি, কারণ আমাদের সবার মনে প্রচন্ড ভয় কাজ করছিলো। সবাই একসাথে রুমে চলে আসি আর নিজেরা নিজেরা একজন আরেক জন কে কথা বলে সাহস দেয়ার চেষ্টা করছি। সেই মুহূর্তে বাহির থেকে আবারো একটি মেয়ের আত্মচিৎকার ভেসে আসে। সে মেয়েটির কণ্ঠ আমাদের অচেনা নয়। সে আমাদের সাথেরই একজনের যাকে আমরা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমরা এখন হতাশ হয়ে পড়ি ,কি করব ভয়ে আমাদের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। আবার সে চিৎকার, আমাকে বাঁচাও, বাঁচাও আমাকে নিয়ে যাও।
এবার আমাদের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে , এই আত্মচিৎকার কোন সাধারণ মানুষের নয়। আমি সবাইকে নিষেধ করি কেউ কোন শব্দ করবি না কিন্তু আমাদের সাথের দুইজন ছেলে বলছে। না ওকে বাঁচাতে হবে সে বিপদে আছে আমাদের ডাকছে আমরা কয়েকজন বললাম না এটা ভালো কিছু হবে বলে মনে হয় না। তোরা কেউ এখন বাইরে যাবিনা। তারা দুজন আমাদের সাথে বাড়াবাড়ি করতে করতে এক পর্যায়ে ঝগড়া লেগে গেলো। আর আত্নচিৎকারের আওয়াজ শুধু বেড়েই চলেছে মনে হচ্ছে আমাদের আশেপাশেই। তারা দুজন এবার বাংলোর বাহিরে যাবে। এক পর্যায়ে আমরা বাকিরা রুমের দরজা খুলি আর বারান্দায় দাঁড়ায় তখন দুজন লাইট নিয়ে তাকে খুঁজতে বের হয়। আর তারা বলছে কই তুই এদিকে আয়। আমরা এখানে এদিকে, আমাদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে রাখি। তারা এভাবে কিছুক্ষন ডাকার পর তাদের একজনের শব্দ বন্ধ হয়ে গেল আরেকজন দৌড়ে এসে বলতে লাগল চল চল তাড়াতাড়ি ভিতরে চল ।
আমরা বাংলোর দরজা খুলতে খুলতে কিছু একটা আমাদের পিছন দিয়ে আসতে লাগল আমরা দরজাটা খুলতে পারছিলাম না মুহূর্তে আমাদের সাথে তিনজন উধাও হয়ে যায় আর মেঝেটা রক্তাক্ত হয়ে থাকে। তখন আমাদের বুঝার আর বাকি থাকল না আমরা বাংলোর ভীতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে চুপচাপ নিজেদের রুমে বসে থাকি আর আমাদের আশপাশ থেকে আসছে একই সাথে অনেকগুলো কান্না ভরা চিৎকার বাঁচাও বাঁচাও।
দরজা খোল, আমাদের নিয়ে যা , চিৎকারের শব্দে আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এভাবেই মৃত্যুকে পাশে নিয়ে সারা রাত কাটিয়ে দেই সকাল হওয়া মাত্রই আমরা বেরিয়ে পড়ি। দরজা খুলে দেখি সবকিছুই ঠিকঠাক মেঝেতে নেই কোনো রক্তের ছাপ,নেই কোনো আত্মচিৎকার। মুহূর্তেই আমরা সেই জায়গা ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হই। সেই বিভীষিকাময় রাত আর কান্নাভরা আর্তচিৎকার আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে থাকবে। আজও আমি রাতে ঘুম থেকে চিৎকার দিয়ে উঠি মনে হয় যেন সেই আত্মচিৎকার এখনো আমার কানে ভেসে আসে।
Leave আত্মচিৎকার to:
Read more #longjourney posts
Best Posts From Farzana Akter Pingki
We have not curated any of farzanaakter's posts yet. But you can encourage our curation team to review posts by visiting them regularly and by referring other readers. Because we give priority to frequently read content.
More Posts From Farzana Akter Pingki
- My Favorite Spinach Fry Recipe Cooked at Home
- My Favorite is Home Cooked Bitter Melon Fry
- My Favorite Chicken Roast Recipe Cooked at Home
- Today I have come up with a delicious recipe with gourd fish among you.
- Homemade Delicious Sweet Pumpkin Fry
- আকাশ
- নিজেকে নিজে ভালোবেসে ভালো রাখা
- ফুলের প্রেমিকা
- কফির মগে আমার রুক্ষ দুপুর
- বোকা ভালোবাসা